
মিসক্যারেজ বলতে গর্ভে সন্তানের মৃত্যুকে বোঝায়। বাংলায় এক কথায় আমরা যাকে বলি গর্ভপাত। মা-বাবার জন্য এটি খুবই দুঃখজনক ঘটনা। এটা নিয়ে মানুষ খুব কমই কথা বলে। তাই আমরা অনেকেই জানি না, আমরা যতটা ভাবি তার চেয়ে বেশিসংখ্যক মিসক্যারেজ বা গর্ভপাত ঘটে থাকে।

মিসক্যারেজ আসলে কী
সহজ কথায় মিসক্যারেজ হলো প্রাকৃতিক গর্ভপাত। গর্ভধারণের ২০ সপ্তাহের আগে ভ্রুণ জরায়ু থেকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বের হয়ে আসলে তাকে মিসক্যারেজ বলে।
মিসক্যারেজের সময় ভ্রুণ (embryo or fetus) ইউটেরাস থেকে ছুটে যায় কিন্তু তখনো গর্ভের বাইরে বেঁচে থাকার উপযুক্ত হয় না। গর্ভধারণের ২০ সপ্তাহের পরে ভ্রুণ নষ্ট হয়ে গেলে, তাকে বলে স্টিলবার্থ বা মৃত সন্তান জন্মদান।
বেশিরভাগ গর্ভপাত হয় প্রেগনেন্সির একদম শুরুর দিকে। তার মানে এই না যে এটা হবু বাবা-মায়ের জন্য কম কষ্টের। তবে যেটা মনে রাখা সবচেয়ে জরুরি সেটা হলো– এটা আপনার দোষে হয়নি।
কেন গর্ভপাত হয় এবং বিপদজনক লক্ষণগুলো কী তা নিয়ে এখানে আমরা বিশদ আলোচনা করব।
মিসক্যারেজ হলে কী হয়
মিসক্যারেজ হলে গর্ভের ভ্রুণ আপনাআপনি শরীর থেকে বের হয়ে যায়। তলপেটে ভীষণ ব্যথা, ভারী রক্তপাত টানা কয়েকদিন এমনকি এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলতে থাকে।
গর্ভপাতের লক্ষণগুলি একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম। কয়েকটি সাধারণ লক্ষণ –
- পিরিয়ডের মত বা তার চেয়েও বেশি রক্তপাত
- জমাট বাঁধা রক্ত, টিস্যু বের হওয়া (মাসিকের সময় যেমন হয়)
- তলপেটে বা কোমরের নিচে ভীষণ ব্যথা
- তিনদিনের বেশি সময় ধরে হালকা রক্তপাত
- গর্ভধারণের লক্ষণ উধাও হয়ে যাওয়া
( বমি বমি ভাব, খাবারে অরুচি, গন্ধের সমস্যা, ক্লান্তি এরকম লক্ষণগুলি চলে যাবে)
মনে রাখবেন, প্রেগনেন্সির সময় অনেকের কোনো সমস্যা ছাড়াই হালকা রক্তপাত হয়।এটি গর্ভপাত বা মিসক্যারেজ না। কিন্তু টানা তিনদিন ধরে হালকা রক্তপাত অথবা ভারী রক্তপাত (১ ঘণ্টায় একটা প্যাড লাগছে) এমন লক্ষণ দেখলে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাবেন।
মিসক্যারেজ কেন হয়
সিনেমা দেখে আমরা অনেকেই মিসক্যারেজ নিয়ে ভুল ধারণা পোষণ করি।গর্ভপাত ব্যায়াম বা শরীরচর্চা, পড়ে যাওয়া, ভারী কিছু তুলতে গিয়ে আহত হওয়া, সেক্স, দুশ্চিন্তা, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া বা মানসিক অশান্তি– এইসব কারণে হয় না। যে প্রেগনেন্সি স্বাভাবিক নয়, ভবিষ্যতে মা ও সন্তান দুজনেই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে, শরীর নিজেই তখন এই প্রেগনেন্সির ইতি টেনে দেয়।এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ঘটনা।
গবেষণা বলে, যত মিসক্যারেজ ঘটে তার অর্ধেক ঘটে অস্বাভাবিক ক্রোমোজমিক বিন্যাসের কারণে। আবার কখনো ভ্রুণের জেনেটিক ডিফেক্ট, আবার কখনো মায়ের শরীরের ইমিউন রিঅ্যাকশন (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রতিক্রিয়া), যা কারো নিয়ন্ত্রণে না, এর জন্যও মিসক্যারেজ ঘটে।
তবে অনেক ক্ষেত্রেই বলা সম্ভব হয় না মিসক্যারেজ ঠিক কেন ঘটেছে।১০০ মিসক্যারেজের ৯৯ টি ঘটনাতেই মায়ের কোনো হাত নেই বা মায়ের পক্ষে এমন কোনো কিছু করা সম্ভব ছিলো না যাতে ভ্রুণটিকে বাঁচানো যেত।
মিসক্যারেজ কতটা কমন
আপনি শুনলে অবাক হবেন যে মিসক্যারেজের হার ১০ থেকে ২০ শতাংশ। মানে ১০০ তে ১০-২০ টি প্রেগনেন্সি মিসক্যারেজে শেষ হয়।
এটা প্রেগনেন্সির বেশ শুরুর দিকে ঘটে, লক্ষণগুলোও সব পিরিয়ডের সঙ্গে মিলে যায়। তাই অনেকে বুঝতেও পারে না যে মিসক্যারেজ ঘটেছে।
আপনি হয়ত অনেককে বলতে শুনেছেন যে এখন বেশি মিসক্যারেজের ঘটনা ঘটে। আগে এরকম দেখা যেত না। এটা কিন্তু সত্য নয়। আসলে আগে মানুষ মিসক্যারেজ নিয়ে এত সচেতন ছিল না। মিসক্যারেজকে এখনকার মতো আইডেন্টিফাই করাও সম্ভব হতো না। এখন মা হওয়া নিয়ে মানুষ অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি সচেতন, হোম প্রেগনেন্সি টেস্টের মাধ্যমে শুরুর দিকেই নিশ্চিত হয়ে যায় যে তিনি মা হতে চলেছেন। তাই এরপর যদি রক্তপাত হয়, তখন তিনি বোঝেন যে এটা স্বাভাবিক পিরিয়ড নয়, বরং মিসক্যারেজ!
কখন ঘটে মিসক্যারেজ
বিশ্বে যত মিসক্যারেজ ঘটে, এর শতকরা ৮০ ভাগ ঘটে প্রেগনেন্সির প্রথম তিন মাসের ভেতর। এরও একটা বড় অংশ ঘটে গর্ভাবস্থার প্রথম সপ্তাহে যখন হয়ত নারী নিজেও জানে না যে সে প্রেগন্যান্ট।
গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় অনেক কিছু ঘটে। ভ্রুণের কোষগুলো ভাগ হয়ে নানা অঙ্গ প্রত্যঙ্গে পরিণত হতে থাকে, প্লাসেন্টা মায়ের শরীর থেকে শিশুর শরীরে রক্ত সরবরাহ করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ঠিক রাখার মত কাজগুলি করতে থাকে। এই ধরনের হাজারো কাজের ভেতর কোন একটার মধ্যে ঝামেলা বা ত্রুটি দেখা দিলে প্রাকৃতিক নিয়মে মিসক্যারেজ হয়ে যায়।
কোন বিষয়গুলো মিসক্যারেজের ঝুঁকি বাড়ায়
যেসব কারণ এখানে আলোচনা করব সেগুলি খুব বেশিমাত্রায় থাকলে খুব কম মাত্রায় মিসক্যারেজের ঝুঁকি থাকে। মানে একটা প্যারাসিটামল খেলেই যে মিসক্যারেজ হয় বা বয়স ৪০ বছর হলে সবার মিসক্যারেজ হয়– এমন না। এইসব কারণ কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিসক্যারেজ ঘটাতে পারে। আবার এসব কারণ ছাড়াই প্রাকৃতিক গর্ভপাত হতে পারে।
বয়স
যাদের বয়স ৪০ এর বেশি তাদের মিসক্যারেজের ঝুঁকি বেশি। বয়স বেশি হলে ডিম্বাণু ও শুক্রাণু দুটোতেই অস্বাভাবিক ক্রোমোজম বা এ সংক্রান্ত জটিলতার ভয় থাকে।
ভিটামিনের অভাব
গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন ডি ও ভিটামিন বি১২ এর ঘাটতি থাকলে মিসক্যারেজের আশংকা বেড়ে যায়। উল্টো ঘটে ভিটামিন এ এর বেলায়। শরীরে ভিটামিন এ বেশি হয়ে গেলে মিসক্যারেজ ঘটতে পারে। এজন্যই গর্ভাবস্থায় ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের ওষুধ খাওয়া ঠিক না।
থাইরয়েডের সমস্যা
গর্ভাবস্থায় থাইরয়েড হরমোন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। থাইরয়েড কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া অর্থাৎ হাইপোথাইরয়েডিজম ও হাইপারথাইরয়েডিজম– দুই ক্ষেত্রেই মিসক্যারেজের ঝুঁকি আছে। তাই থাইরয়েডের সমস্যা আগে থেকে থাকলে, গর্ভাবস্থায় অবশ্যই গাইনিকে সেটা জানাতে হবে। প্রেগনেন্সিতে থাইরয়েডের মাত্রা পরীক্ষা করে দেখে প্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন করতে হবে।
কম ওজন বা অতিরিক্ত ওজন
বডি মাস ইনডেক্স (BMI) হলো উচ্চতার তুলনায় শরীরের ওজন ঠিক আছে কি না তা বোঝার একটি সহজ হিসাব। এটি দেখে বোঝা যায় কেউ কম ওজনের, স্বাভাবিক, নাকি বেশি ওজনের মধ্যে পড়ছেন।
যাদের বিএমআই (BMI) ১৮ এর কম বা ৩০ এর বেশি তাদের মিসক্যারেজের ঝুঁকি বেশি। তাই সন্তান নেবার পরিকল্পনা করার আগে ওজন ঠিক করুন।
ধূমপান বা মাদক গ্রহণ
পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে সিগারেটের ধোঁয়া যদি শরীরে ঢোকে তা প্রেগনেন্সিতে মিসক্যারেজের ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে সন্তানের মা বা বাবা কারও যদি বেশি মাত্রায় অ্যালকোহল নেবার ইতিহাস থাকে বা বিশেষ করে মা যদি গর্ভাবস্থায় মাত্রাতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন করে, তাহলে মিসক্যারেজের আশঙ্কা বেড়ে যায়।
যৌন রোগ
সিফিলিস বা ভাইরাল হেপাটাইটিসের মতো যৌনরোগ মিসক্যারেজ এর ঝুঁকি বাড়ায়।
জরায়ুতে বড় টিউমার
জরায়ুতে টিউমার, ফাইব্রয়েড নারীদের সাধারণ সমস্যা। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই সাধারণ রোগই মিসক্যারেজের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে বড় আকৃতির সিস্ট, ফাইব্রয়েড বা টিউমার থাকলে প্রেগনেন্সি হরমোনের কারণে সেগুলো আরো বড় আকার ধারণ করে ভ্রুণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
দীর্ঘস্থায়ী রোগ
অটোইমিউন ডিজিজ, কিডনির সমস্যা, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস) বা ডায়বেটিস, উচ্চ রক্তচাপের মত অসুখের ক্ষেত্রেও মিসক্যারেজের ঝুঁকি থেকে যায়। এসব রোগ থাকলে এই প্রেগনেন্সিকে “বেশি ঝুঁকিপূর্ণ প্রেগনেন্সি” ঘোষণা করা হয় এবং পুরো প্রেগনেন্সিতে অতিরিক্ত সতর্কতা পালন করা হয়।
কিছু ওষুধ
টাইলানোল বা প্যারাসিটামল-নাপার মত সাধারণ ওষুধও প্রেগনেন্সিতে ডাক্তারের পরামর্শ না নিয়ে খাবেন না। সাধারণ ব্যথা বা জ্বরের ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় মিসক্যারেজসহ নানা রকম সমস্যা (বার্থ ডিফেক্ট) দেখা যাওয়ার অসংখ্য প্রমাণ আছে।
বিষাক্ত পরিবেশ
দূষিত পরিবেশ বিশেষ করে মাটি-পানিতে যদি সীসার মত ধাতু থাকে, তা মিসক্যারেজের ঝুঁকি বাড়ায়। বিষাক্ত ধাতু পরিবেশ থেকে নানা মাধ্যমে প্রেগনেন্ট নারীর শরীরে ঢোকে এবং গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ায়।
ঘন ঘন সন্তান জন্মদান
সন্তান জন্মানোর পর নারীর শরীর ও জরায়ু পুরোপুরি ফিট হতে প্রায় দুই বছর সময় লেগে যায়। এক সন্তান জন্মানোর খুব অল্প সময়ের বিরতিতে (২ বছরেরও কম) আবার প্রেগনেন্ট হলে মিসক্যারেজের আশঙ্কা বেড়ে যায়।
গর্ভপাতের ঝুঁকি কিভাবে কমানো সম্ভব
মিসক্যারেজ হলে তা ঠেকানো যায় না। তবে আগে থেকে ঝুঁকি কমানোর জন্য কিছু পদক্ষেপ নেয়া যেতেই পারে। আর এর জন্য স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের কোন বিকল্প নেই।
- সন্তান নেবার পরিকল্পনা করলে আগেই ওজন ঠিক রাখুন।
- ডায়বেটিস, রক্তচাপ, থাইরয়েড পরীক্ষা করে দেখুন এগুলো ঠিক আছে কিনা। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিন।
- প্রিনেটাল ভিটামিন খাওয়া শুরু করুন। বিশেষ করে ফলিক এসিড ও ভিটামিন বি খান।
- যৌনরোগ আছে কিনা পরীক্ষা করুন। থাকলে চিকিৎসা নিন।
- সিগারেট, অ্যালকোহল, মাদক দ্রব্য থেকে দূরে থাকুন।
যে কোনো ওষুধ খাওয়ার আগে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে নিন।
গর্ভপাতের বিভিন্ন প্রকার
মিসক্যারেজ কখন এবং কেন হলো তার ওপরে নির্ভর করে একে কয়েক ভাগে ভাগ করা হয়।
কেমিক্যাল প্রেগনেন্সি গর্ভাবস্থার একেবারে প্রথম দিকে, প্রথম সপ্তাহে এই ধরনের মিসক্যারেজ হয়। এখানে ডিম্বাণু ঠিকই নিষিক্ত হয়, তবে তা জরায়ুর ভেতর ইমপ্ল্যান্টেড হয় না। এর ফলে শরীরে প্রেগনেন্সি হরমোন hCG বেড়ে প্রেগনেন্সি টেস্টে ঠিকই ‘পজিটিভ’ রেজাল্ট আসলেও আলট্রাসাউন্ডে কোন প্লাসেন্টা দেখা যাবে না।
সাধারণত এক্ষেত্রে হবু মা নিজেও বুঝতে পারেন না যে মিসক্যারেজ হয়েছে।
ব্লাইটেড ওভাম এক্ষেত্রে ডিম্বাণু নিষিক্ত হয়, জরায়ুর দেয়ালে স্থাপিতও হয়, তবে প্লাসেন্টা বড় হয় না। ক্রোমোজমজনিত অস্বাভাবিকতার কারণে এরকম হয়। আল্ট্রাসাউন্ডে খালি বা শূন্য জেস্টেশনাল স্যাক দেখতে পাওয়া যায়।
থ্রেটেনড মিসক্যারেজ গর্ভাবস্থার ২০ সপ্তাহের আগ পর্যন্ত কোনো সময় যদি ডাক্তার মনে করেন যে বেশি রক্তপাত হলে গর্ভপাতের ঝুঁকি থাকতে পারে, তখন একে থ্রেটেন্ড মিসক্যারেজ বা “গর্ভপাতের আশঙ্কা” বলা হয়।
এই অবস্থায় আসলে তখনো গর্ভপাত হয় না; আল্ট্রাসাউন্ডে অনেক সময় শিশুর হার্টবিটও শোনা যায়।
আসলে, যেসব নারীর থ্রেটেন্ড মিসক্যারেজ হয় তাদের অর্ধেকেরও বেশি ডাক্তারদের পরামর্শ মেনে চললে সুস্থভাবে পুরো সময়ের গর্ভধারণ সম্পন্ন করেন।
ডাক্তার এ ক্ষেত্রে বিশ্রাম নেওয়া বা প্রয়োজন হলে ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দিতে পারেন, যাতে গর্ভপাতের ঝুঁকি কমে।
ইনেভিটেবল মিসক্যারেজ যদি কোনো নারীর খুব বেশি রক্তপাত হয় এবং শারীরিক পরীক্ষায় দেখা যায় জরায়ুর মুখ (সার্ভিক্স) খুলে গেছে, তখন এই অবস্থাকে ইনেভিটেবল মিসক্যারেজ বা “অবশ্যম্ভাবী গর্ভপাত” বলা হয়।
এর মানে হলো গর্ভপাতের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।
জরায়ুর মুখ খোলা থাকা মানে শরীর স্বাভাবিকভাবেই গর্ভের টিস্যু বের করে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
দুঃখজনক হলেও এই অবস্থায় গর্ভপাত থামানো আর সম্ভব হয় না।
মিসড মিসক্যারেজ কখনো কখনো কোনো কোনো নারীর গর্ভপাত হয় কিন্তু তাতে রক্তপাত হয় না। একে মিসড মিসক্যারেজ বলা হয়।
এই ক্ষেত্রে নারী নিজেও বুঝতে পারেন না যে গর্ভপাত হয়ে গেছে।
পরবর্তী গর্ভকালীন চেকআপে, আল্ট্রাসাউন্ড করার সময় যখন ভ্রূণের হৃদস্পন্দন পাওয়া যায় না, তখন বিষয়টি ধরা পড়ে।
নিচের সমস্যাগুলোকে সরাসরি মিসক্যারেজ (গর্ভপাত) বলা না হলেও, এগুলোও প্রেগনেন্সি শেষ হওয়ারই ঘটনা।
এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি (Ectopic Pregnancy) এই ধরনের গর্ভধারণে ভ্রূণ জরায়ুর ভেতরে না বসে ভুল জায়গায় বসে—সাধারণত ফলোপিয়ান টিউব (fallopian tube) বা কখনো সার্ভিক্সে। এক্টোপিক প্রেগন্যান্সিতে হওয়া পেট ব্যথা ও রক্তপাত সাধারণ গর্ভপাতের লক্ষণের মতোই লাগে। কিন্তু ভ্রূণটি যদি সেই ভুল জায়গা থেকে ফেটে যায়, তাহলে মারাত্মক জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই গর্ভাবস্থার শুরুতে রক্তপাত বা পেট ব্যথা হলে অবশ্যই দ্রুত চিকিৎসকের কাছে দেখানো জরুরি, যাতে এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি আছে কিনা তা নিশ্চিত করা যায়।
মোলার প্রেগন্যান্সি (Molar Pregnancy) কখনো কখনো এমন একটি ডিম্বাণু, যার ভেতরে প্রয়োজনীয় জিনগত উপাদান থাকে না, সেটি শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হলে জরায়ুর ভেতরে ভ্রূণের বদলে সিস্টের মতো একটি মাংসপিণ্ড তৈরি হয়। এই কোষগুলো কখনোই শিশুর মতো বেড়ে ওঠে না। তবে এতে শরীরে গর্ভধারণের হরমোন বেড়ে যায়, ফলে কিছু সময়ের জন্য মনে হতে পারে তিনি গর্ভবতী। কিন্তু এই ধরনের গর্ভধারণ শেষ পর্যন্ত সবসময়ই গর্ভপাতের মাধ্যমে শেষ হয়।
মিসক্যারেজ থামানো বা বন্ধ করা কি সম্ভব
যদি জরায়ুমুখ (সার্ভিক্স) ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করে, কিন্তু কোনো রক্তপাত বা ব্যথা না থাকে, তাহলে ডাক্তার এটাকে ইনকম্পিটেন্ট সার্ভিক্স বলে সন্দেহ করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে দেরিতে গর্ভপাত ঠেকানোর জন্য ডাক্তার সারক্লাজ করতে পারেন—অর্থাৎ জরায়ুমুখ সেলাই করে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
প্রায় তিনজনের মধ্যে দুইজন নারীর ক্ষেত্রে মিসক্যারেজ নিজে নিজে সম্পন্ন হয়, বাকি একজনের ক্ষেত্রে সেটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মানে, ভ্রূণ ছাড়াও প্লাসেন্টা ও জরায়ুর ভেতরের অতিরিক্ত আস্তরণ সবই শরীর থেকে নিজে নিজে বের হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হতে কখনো কখনো দুই সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
তবে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারীর ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার কিছু অংশ জরায়ুর ভেতরে থেকে যায়, যাকে ডাক্তাররা বলেন রিটেইন্ড প্রোডাক্টস অব কনসেপশন। শরীর স্বাভাবিক হতে এবং নিয়মিত মাসিক শুরু হওয়ার জন্য জরায়ু পুরোপুরি পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
এ জন্য ডাক্তার সাধারণত প্রথমে ওষুধ দেন, যাতে শরীর নিজে থেকেই জরায়ু পরিষ্কার করতে পারে। অনেক সময় এই ওষুধ একাধিকবার নিতে হতে পারে। প্রায় ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ওষুধ কাজ না করলে, ডাক্তারকে ডি অ্যান্ড সি (D&C) নামের একটি ছোট অস্ত্রোপচার করতে হতে পারে।
গর্ভপাতের পর সংক্রমণ এড়াতে কিছু বাড়তি সতর্কতা দরকার। যেমন—কমপক্ষে দুই সপ্তাহ যোনিপথে কিছুই প্রবেশ করানো যাবে না।এ সময় যৌন মিলন থেকেও বিরত থাকতে হবে, এবং মেনস্ট্রুয়াল কাপ বা পিরিয়ডে ব্যবহার করা হয় এরকম দ্রব্যগুলো ব্যবহার বন্ধ রাখতে হবে। (প্যাড ছাড়া)
আপনার যদি একাধিক মিসক্যারেজ থাকে, ভবিষ্যত কী
অনেকেরই থাকে। শতকরা ৫০ ভাগ ক্ষেত্রে ডাক্তাররা এর কারণ বের করতে পারেন না। তবে বাকি অর্ধেক ক্ষেত্রে দেখা যায় রোগীর অটোইমিউন ডিজিজ আছে। সেক্ষেত্রে মায়ের ইমিউন সিস্টেম ভ্রুণকে শরীরের জন্য ক্ষতিকর ভেবে আক্রমণ করে বা রোগীর থাইরয়েড নিয়ন্ত্রিত না। এছাড়াও আরও অনেক ডিজঅর্ডারের ক্ষেত্রে শরীরের সিস্টেম গর্ভাবস্থাকে বাতিল করে দেয়।
অন্তত দুবার মিসক্যারেজ ঘটলেই স্বামী ও স্ত্রী দুজনকেই পরীক্ষা করে দেখতে হবে। অনেকসময় শুক্রাণুর সমস্যা থেকেও ক্রোমোজনাল অস্বাভাবিকতা বা রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে, আর মিসক্যারেজ হতে পারে।
অনেক নারীর শরীর আবার জন্মগত কারণে বা অন্য কিছুর প্রভাবে এমনসব এন্টিবডি উৎপন্ন করে যা নিজের টিস্যুকেই আক্রমণ করে। এর ফলেও মিসক্যারেজ হতে পারে। জরায়ুর আলস্ট্রাসাউন্ড, এমআরআই বা সিটিক্যান করেও কী সমস্যা, তা বের করা যেতে পারে। যদি সমস্যা চিহ্নিত করা যায়, সেক্ষেত্রে পরবর্তী গর্ভাবস্থার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
ইতিবাচক দিক হচ্ছে, আমেরিকান কলেজ অব অবসটেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস (এসিওজি) এর মতে, কমপক্ষে দুবার গর্ভপাতের পরও শতকরা ৬৫ ভাগ নারী ভবিষ্যতে সফলভাবে সুস্থ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, মিসক্যারেজ একটা দুর্ঘটনা মাত্র। এর জন্য কাউকে দোষারোপ করার কোনো প্রশ্নই আসে না। মা বা বাবা এর জন্য দায়ী নন।
গর্ভপাতে একজন মা যে ধরনের শারীরিক, মানসিক ট্রমার ভেতর দিয়ে যায়, আশেপাশের সবার উচিত এই সময়ে তাঁকে মানসিকভাবে সর্বোচ্চ সমর্থন করা, যত্ন করা, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সাহায্য করা।
সূত্র:
- American College of Obstetricians and Gynecologists, Bleeding During Pregnancy, May 2021.
- American College of Obstetricians and Gynecologists, Dilation and Curettage, June 2020.
- American College of Obstetricians and Gynecologists, Early Pregnancy Loss, January 2022.
- American College of Obstetricians and Gynecologists, Ectopic Pregnancy, February 2018.
- American College of Obstetricians and Gynecologists, Having a Baby After Age 35: How Aging Affects Fertility and Pregnancy, October 2020.
- American College of Obstetricians and Gynecologists, Repeated Miscarriages, November 2020.
- American Journal of Obstetrics & Gynecology, Second-Trimester Loss and Subsequent Pregnancy Outcomes: What is the Real Risk?, December 2007.
- American Society for Reproductive Medicine, Fibroids and Fertility, 2015.
- American Thyroid Association, Thyroid and Pregnancy, July 2014.
- Centers for Disease Control and Prevention, What Is Stillbirth?, November 2020.
- Centers for Disease Control and Prevention, National Institute for Occupational Safety and Health (NIOSH), Lead & Other Heavy Metals – Reproductive Health, November 2019.
- Cleveland Clinic, Hysteroscopy, July 2018.

